এই যেন প্রাণের উৎসব, উৎসবে আনন্দে মাতোয়ারা হাজার দর্শক, পুরানো বছরকে বিদায় জানিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নিতে মারমা সম্প্রদায় পালন করে আসছেন মাহা: সাংগ্রাই রি লং পোয়ে বা সাংগ্রাই জল উৎসব। যুবক যুবতীরা একে অপরকে পানি ছিটানো মাধ্যমে সকল দু:খ গ্লানি বেদনাকে ধুয়ে মুছে দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়।
রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার ঐতিহ্যবাহী চিৎমরম ইউনিয়ন এর চিংম্রং বৌদ্ধ বিহার মাঠে সাংগ্রাই জল উৎসব উদযাপন কমিটির আয়োজনে বুধবার ( ১৫ এপ্রিল ) সকাল ১০ টায় মারমা সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব সাংগ্রাই জল উৎসবের উদ্বোধন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী এ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান। এসময় তিনি বলেন, এটি মারমা সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় সামাজিক উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে এখানে সকল ধর্ম বর্ণ জাতি গোষ্ঠীর মিলন ঘটেছে। এদেশ একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনার দেশ।
সাংগ্রাঁই জল উৎসব উদযাপন কমিটির আহবায়ক উথোয়াই মং মারমার সভাপতিত্বে বেতার শিল্পী সানুচিং মারমা এবং সাচিং উ মারমার
সঞ্চালনায় এসময় সরকার বেসরকারি পদস্থ কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ছাড়াও হাজার হাজার লোকের সমাগম ঘটেছে।
মুল মঞ্চে মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী নাচ গান পরিবেশনার পাশাপাশি মাঠের একপাশে মারমা তরুন তরুনীরা জল খেলায় মেতে উঠেন। এছাড়া এদিন ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ছাড়াও সাংগ্রাই মহা শোভাযাত্রা বের করা হয়।
সাংগ্রাই জল উৎসবে অংশ নিতে আসা মারমা সম্প্রদায়ের তরুণ তরুণীরা বলেন আজ আমরা সাংগ্রাই উৎসবে এসেছি জল ছিটাতে। পুরাতন বর্ষকে বিদায় দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করতে। এটা আমাদের প্রাণের উৎসব। #
Blog

চিংম্রং বৌদ্ধ বিহারে সাংগ্রাঁই জল উৎসবে আনন্দে মাতোয়ারা হাজার দর্শক: উদ্বোধন করলেন পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান

বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপন পরিষদ,মাঝিরবস্তি,তবলছড়ির উদ্যোগে বণার্ঢ্য শোভা যাত্রা অনুষ্ঠিত।
পুরান বছরের সমস্ত হতাশা,দুঃখ,গ্লানিকে ভুলে গিয়ে নুতন আশা আনন্দ উদ্দীপনায় “বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ” কে বরণ করলো পার্বত্যবাসী।।
বাংলা বর্ষবরণ উপলক্ষে আজ ১৫ এপ্রিল বুধবার বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপন পরিষদ,মাঝিরবস্তি,তবলছড়ি উদ্যোগে সকালে বণার্ঢ্য শোভা যাত্রা অনুষ্ঠিত হয় এবং শোভাযাত্রা শেষে শাহ্ বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে পান্তা ভাত উৎসব’র মধ্য দিয়ে বাংলা নতুন বছর ১৪৩৩ বাংলাকে বরণ করা হয়। বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উদযাপন পরিষদ, মাঝিরবস্তি, তবলছড়ি,রাঙ্গামাটি আবাহন বাংলার এ ঐতিহ্যাবাহি আয়োজন করেন। ৩৪ তম নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠান উপলক্ষে আয়োজিত বৈশাখী শোভাযাত্রা এবং পান্তাভাত উৎসবে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কৃষিবিদ কাজল তালুকদার, বৈশাখী শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি দল বিএনপি রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার সাধারন সম্পাদক ও বর্ষবরণ উদযাপন পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা এ্যাড, মামুনুর রশীদ। বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রায় বিশেষ অতিথি হিসাবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদি যুব দল,রাঙ্গামাটি জেলার সাধারন সম্পাদক ও বাংলা বর্ষ বরণ উদযাপন পরিষদের প্রধান পৃষ্টপোষক আবু শাদাৎ মোঃ সায়েম,জেলা পরিষদ সদস্য মোঃ হাবীব আজম এবং বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খীষ্টান ঐক্য পরিষদ,রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা সভাপতি শিক্ষক অরুপ কুমার মুৎসুদ্দী। বৈশাখী শোভাযাত্রাটি সকাল সাড়ে ৯ ঘটিকায় তবলছড়ি মিনিষ্ট্রী ক্লাব প্রাঙ্গন থেকে শুরু হয়ে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে শাহ্ বহুমূখী উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রা শেষে সকলে বাংলাদেশ ও বাঙালিদের ঐতিহ্য পান্তা ভাত উৎসবে অংশ নেয় । #
সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠায় ধর্মীয় মূল্যবোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ — পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান বলেছেন, সমাজে শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবকল্যাণ প্রতিষ্ঠায় ধর্মীয় মূল্যবোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সকলের সহযোগিতা, পরামর্শ ও সমর্থনের মাধ্যমে এই ধরনের মহতী আয়োজন সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।
মন্ত্রী আজ রাংঙ্গামাটি জেলায় রাজবন বিহার প্রাঙ্গণে বাংলা নববর্ষ -১৪৩৩ , বুদ্ধমূর্তি দান, সংঘ দান , অষ্টপরিষ্কার দান,হাজার প্রদীপ দান বিশ্বশান্তি প্যাগোডার উদ্দেশ্য টাকা দান,পরিত্রাণ সূত্র শ্রবন ও বাংলাদেশী বৌদ্ধদের ধর্মীয় সংঘ রাজ ভদন্ত ধর্মপ্রিয় মহাস্থবির উপ সংঘরাজ ভদন্ত প্রিয়দর্শী মহাস্থবির -কে শ্রদ্ধা নিবেদন সম্মাননা স্মারক প্রদান উপলক্ষে মহতী পুণ্যঅনুষ্ঠান -২০২৬ -এ প্রধান পূর্ণ্যার্থীর বক্তব্যে এসব কথা বলেন ।
মন্ত্রী বলেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সমাজে নৈতিকতা, শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে সরকারের পাশাপাশি সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
মন্ত্রী আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সম্প্রদায়ের এই উৎসবের মূল বার্তা হলো শান্তি ও সম্প্রীতি। আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননেতা তারেক রহমান চান সকল শ্রেণি, পেশা ও সম্প্রদায়ের মানুষ সমান গুরুত্ব দিয়ে নিজ নিজ সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পরিচালনা করবেন। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বর্তমান সরকার পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের স্বকীয়তা রক্ষা ও উন্নয়নে নিরলস কাজ করছে।
দীপেন দেওয়ান বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিসত্তা সম্প্রদায়ের প্রধান সামাজিক উৎসবগুলো যার যার সম্প্রদায়ের নিজস্ব স্বকীয় রীতি ও নামে পালিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে শ্রদ্ধেয় ধর্মপ্রাণ মহাস্থবির, চতুর্থ মহাসংঘরাজ, প্রিয়দর্শী মহাস্থবির উপসংঘরাজসহ অন্যান্য ভিক্ষুসংঘসহ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক বৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রী অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকল ভান্তে, দায়ক-দায়িকা, উপাসক-উপাসিকা এবং সম্মানিত সাংবাদিকবৃন্দকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও কৃতজ্ঞতা জানান ।
অনুষ্ঠানের শেষে মন্ত্রী বিশ্বশান্তি ও জগতের সকল প্রাণীর সুখ কামনা করে প্রার্থনা করেন।#
সব জাতিসত্তার ঐক্যে গড়ে উঠবে নতুন বাংলাদেশ : দীপেন দেওয়ান
সব জাতিসত্তার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় একটি নতুন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী জনাব দীপেন দেওয়ান এমপি। তিনি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় সামাজিক উৎসবগুলো কেবল আনন্দ আয়োজনের মাধ্যম নয়, বরং এগুলো আমাদের ঐতিহ্য, রীতিনীতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আজ সোমবার দুপুরে রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কৃষিবিদ কাজল তালুকদারের বাসভবনে আয়োজিত ‘বিজু-সাংগ্রাই-বৈসু-বিষু-বিহু-চাংক্রান-চাংলান’ উৎসব ও বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ উপলক্ষে আয়োজিত শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী জনাব দীপেন দেওয়ান এমপি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি জাতিগোষ্ঠী সম্প্রদায় অত্যন্ত উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে তাদের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক উৎসবগুলো পালন করছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের শিকড় ও সংস্কৃতি রক্ষায় এই ঐতিহ্যগুলো সংরক্ষণ এবং পুনরুদ্ধার করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করেন মন্ত্রী জনাব দীপেন দেওয়ান।
পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী জনাব দীপেন দেওয়ান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবগুলো আমাদের পারস্পরিক সম্প্রীতির প্রতীক। এই সংস্কৃতির ধারাকে আরও শক্তিশালী করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দেশের সকল পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন ও তাদের স্বকীয় সংস্কৃতি রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও উন্নয়ন প্রসঙ্গে পার্বত্য মন্ত্রী জনাব দীপেন দেওয়ান এমপি বলেন, গণতান্ত্রিক ভোটে বিজয়ী এই সরকার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেতা তারেক রহমানের নেতৃত্বে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখবে। মন্ত্রী বলেন, আমি আশা করি, পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সম্প্রদায়ের এই সামাজিক উৎসবগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে স্ব-স্ব নামে পালনের পূর্ণ অধিকার ও স্বীকৃতি পাবে। তিনি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের হাতকে শক্তিশালী করার জন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করেন এবং ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানের মাধ্যমে দেশপ্রেমের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কৃষিবিদ কাজল তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক নাজমা আশরাফীসহ সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। শেষে মন্ত্রী পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশের মানুষকে বাংলা নববর্ষ ও বিজুর মৈত্রীয় শুভেচ্ছা জানান।#

মৃত্যুকে হার মানাল ডা. গৌরবরা : নতুন জীবন পেল সাপে কাঁটা রুবেল!
গত ৭এপ্রিল দুপুরে রাঙামাটি শহরের ইসলামপুরের ১৪ বছরের কিশোর রুবেলের ডান হাতে একটি কিং কোবরা (শঙ্খচূড়) কামড় দেয়। সাপটি চিনতে পারেনি রুবেল। তখনো কেউ ভাবেনি সামনের ১৮ ঘণ্টা কতটা ভয়াবহ হতে চলেছে।
রুবেলের শরীরে নিউরোটক্সিক বিষ ছড়াতে শুরু করল। আজ সকালে যখন রাঙামাটির হৃদরোগীদের ভরসা ডা. উসা মং Usamong Marma রুবেলকে দেখতে এলেন, তিনি দেখেই বুঝে গেলেন বিপদ কতটা গভীরে। রুবেল চোখ মেলে তাকাতে পারছে না—চোখের পাতা ভারী হয়ে নেমে আসছে। সারা শরীর বিষের প্রভাবে অবশ হয়ে আসছে।
সবচেয়ে আতঙ্কজনক মুহূর্তটি এল যখন তাকে পানি পান করতে দেওয়া হলো। রুবেল পানিটুকু গিলতে পারল না; গলার মাংসপেশি অবশ হয়ে যাওয়ায় সেই পানি নাক দিয়ে বেরিয়ে এল। এটিই ছিল শেষ সংকেত—শ্বাসতন্ত্রের পেশিগুলো যেকোনো সময় কাজ করা বন্ধ করে দেবে!
হাসপাতালের করিডোরে তখন শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনা। খবর গেল ডা. গৌরব দেওয়ানের Gourab Dewan কাছে—যিনি আদিবাসীদের মধ্যে প্রথম মেডিসিনে এফসিপিএস এবং বাংলাদেশের সাপের কামড় ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকার অন্যতম কারিগর।
জীবন-মৃত্যুর এই দাবার ছকে রুবেলকে বাঁচাতে তিনি নিজের হাতে হাল ধরলেন। সঙ্গে রয়েছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. উসা মং এবং ইন্টার্ন ডা. উ মে সহ চিকিৎসক দল Sawkat Akbar, Nuyan Khisa । পুরো ওয়ার্ডে যেন পিনপতন নীরবতা। রুবেলের শরীরে পুশ করা হলো অ্যান্টি-ভেনম। প্রতিটি সেকেন্ড যেন একেকটি যুগের মতো কাটছে।
চিকিৎসক দল আর রুবেলের পরিবারের চোখেমুখে তখন প্রার্থনা আর বিজ্ঞানের এক অদ্ভুত লড়াই। সবার মনে একটাই প্রশ্ন—বিষের প্রভাব কি কমবে? না কি পেশিগুলোর অসাড়তা কেড়ে নেবে প্রাণবায়ু?
কয়েক মিনিট পর চিকিৎসকদের চোখেমুখে তৃপ্তির আভা দেখা দিল। রুবেলের সেই ভারী হয়ে আসা চোখের পাতাগুলো কাঁপতে শুরু করল। সে অস্পষ্ট স্বরে কিছু বলার চেষ্টা করল। যে আঙুলগুলো পাথর হয়ে গিয়েছিল, সেগুলো সামান্য নড়ে উঠল। যমদূতকে দরজার ওপাশ থেকে ফিরিয়ে দিয়ে চিকিৎসকরা রুবেলকে ছিনিয়ে আনলেন জীবনের এই পাশে।
বাংলাদেশের সাপের কামড় ব্যবস্থাপনা গাইডলাইন আর একদল নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসকের হাত ধরে মৃত্যু আজ হেরে গেল। আজ রুবেলের নতুন জন্মের দিন।
………………………………………………………………….
শিক্ষণীয় ও কিছু তথ্য:
সাপের বিষ প্রধানত দুই ধরনের প্রভাব ফেলে:নিউরোটক্সিক (Neurotoxic): যেমন গোখরো বা কিং কোবরা। এই বিষ সরাসরি স্নায়ুতন্ত্রকে অবশ করে দেয়। চোখের পাতা পড়ে যাওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া বা গিলতে না পারা এর লক্ষণ। শেষ পর্যায়ে শ্বাসকষ্ট হয়ে রোগী মারা যায়।
হিমোটক্সিক (Hemotoxic): যেমন রাসেলস ভাইপার বা গ্রিন পিট ভাইপার। এই জাতীয় সাপের বিষ রক্ত নষ্ট করে দেয়, ফলে শরীরের বিভিন্ন জায়গা থেকে রক্তক্ষরণ শুরু হয় এবং কিডনি অকেজো হয়ে রোগী মারা যায়।
মনে রাখবেন:
সাপে কামড় দিলে রোগীকে অবশ্যই ১৮ থেকে ২৪ ঘণ্টা হাসপাতালে পর্যবেক্ষণে রাখতে হয়। অনেক সময় বিষের লক্ষণ দেরিতে প্রকাশ পায়। পাহাড়ি অঞ্চলে পাহাড়ি অনেকেই ধৈর্য হারিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে ওঝা বা কবিরাজের কাছে যান, যা মৃত্যু ডেকে আনে। সাপে কামড়ালে ওঝা নয়, একমাত্র হাসপাতালেই সঠিক চিকিৎসা সম্ভব।#
বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে ৪৫০ পদে নিয়োগ : অষ্টম শ্রেণি পাসেও আবেদনের সুযোগ
দেশের সশস্ত্র বাহিনীতে যোগ দেয়ার আগ্রহীদের জন্য বড় সুযোগ নিয়ে এসেছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। বাহিনীটিতে নাবিক ও এমওডিসি (নৌ) পদে মোট ৯টি শাখায় ৪৫০ জন জনবল নিয়োগ দেয়া হবে। এ নিয়োগে শুধুমাত্র পুরুষ প্রার্থীরা আবেদন করতে পারবেন। আবেদন গ্রহণ শুরু হয়েছে ১৮ মার্চ থেকে, চলবে ২০ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত।
চাকরির বিবরণ
১. শাখা: ডিই/ইউসি (সিম্যান, কমিউনিকেশন ও টেকনিক্যাল)
পদসংখ্যা: ৩০০
যোগ্যতা: এসএসসি (বিজ্ঞান)/সমমান, জিপিএ–৩.৫০ বা তদূর্ধ্ব
২. শাখা: রেগুলেটিং
পদসংখ্যা: ১৫
যোগ্যতা: এসএসসি/সমমান, জিপিএ–৩.০০ বা তদূর্ধ্ব
…………………………………………………………………
৩. শাখা: রাইটার
পদসংখ্যা: ১৮
যোগ্যতা: এসএসসি/সমমান, জিপিএ–৩.০০ বা তদূর্ধ্ব৪. শাখা: স্টোর
পদসংখ্যা: ১৮
যোগ্যতা: এসএসসি/সমমান, জিপিএ–৩.০০ বা তদূর্ধ্ব৫. শাখা: মেডিকেল
পদসংখ্যা: ১৮
যোগ্যতা: জীববিজ্ঞানসহ এসএসসি (বিজ্ঞান), জিপিএ–৩.৫০ বা তদূর্ধ্ব
৬. শাখা: কুক
পদসংখ্যা: ৩৫
যোগ্যতা: এসএসসি/সমমান, জিপিএ–২.৫০ বা তদূর্ধ্ব৭. শাখা: স্টুয়ার্ড
পদসংখ্যা: ২০
যোগ্যতা: এসএসসি/সমমান, জিপিএ–২.৫০ বা তদূর্ধ্ব৮. শাখা: টোপাস
পদসংখ্যা: ২০
যোগ্যতা: অষ্টম শ্রেণি পাস
৯. শাখা: এমওডিসি (নৌ)
পদসংখ্যা: ৮
যোগ্যতা: এসএসসি/সমমান, জিপিএ–৩.০০ বা তদূর্ধ্বশারীরিক যোগ্যতা (ন্যূনতম)
সিম্যান: উচ্চতা ১৬৭.৫ সেমি (৫’-৬”)
রেগুলেটিং: উচ্চতা ১৭২.৫ সেমি (৫’-৮”)
অন্যান্য শাখা: উচ্চতা ১৬২.৫ সেমি (৫’-৪”)
এমওডিসি (নৌ): উচ্চতা ১৬৭.৫ সেমি (৫’-৬”)
বুকের মাপ: ৭৬-৮১ সেমি (সম্প্রসারণ ৫ সেমি)
ওজন: বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ীবয়স
১ জুলাই ২০২৬ তারিখে
নাবিক: ১৭–২০ বছর
এমওডিসি (নৌ): ১৭–২২ বছরবেতন ও ভাতা
সশস্ত্র বাহিনীর নির্ধারিত বেতন স্কেল অনুযায়ী বেতন ও অন্যান্য ভাতা প্রদান করা হবে।আবেদনের অযোগ্যতা
কোনও ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত বা দণ্ডপ্রাপ্ত হলে.
সরকারি চাকরি বা সশস্ত্র বাহিনী থেকে বহিষ্কৃত হলে
দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে
প্রশিক্ষণ চলাকালে পূর্বে স্বেচ্ছায় চাকরি ত্যাগ করলেআবেদনের নিয়ম
প্রার্থীদের নির্ধারিত ওয়েবসাইটে গিয়ে Sailor Section থেকে Apply Now-এ ক্লিক করে প্রাথমিক যোগ্যতা যাচাই করতে হবে। এরপর অ্যাকাউন্ট খুলে অনলাইনে আবেদন ফি (৩০০ টাকা) পরিশোধ করতে হবে। ফি দেওয়া যাবে ব্যাংক কার্ড বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে।
ফি পরিশোধের পর আবেদন ফরম পূরণ করে সাবমিট করতে হবে এবং ‘নাবিক-১’ ফরম ডাউনলোড ও প্রিন্ট করে রাখতে হবে। নির্ধারিত তারিখে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে হবে।ভর্তি পরীক্ষা
২৬ এপ্রিল থেকে ২৪ মে ২০২৬ পর্যন্ত তিনটি কেন্দ্রে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে:
বানৌজা ঢাকা, খিলক্ষেত, ঢাকা
বানৌজা তিতুমীর, খালিশপুর, খুলনা
নৌবাহিনী ভর্তি ও তথ্যকেন্দ্র, টাইগার পাস, চট্টগ্রাম
নির্ধারিত দিনে সকাল ৮টার মধ্যে পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে হবে।
++ আবেদন শেষ সময়সীমা: ২০ এপ্রিল ২০২৬।++ বিস্তারিত তথ্য জানতে সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইটে দেখা যাবে। #

বিশ্বের সংঘাতময় বাস্তবতায় ভ্রাতৃত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত: রাঙামাটি শাহ্ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় ৯৮ ব্যাচের পুনর্মিলনী’ ২০২৬
বিশ্ব যখন যুদ্ধ ও সংঘাতের উত্তাপে ক্রমাগত অস্থির হয়ে উঠছে, ঠিক সেই প্রেক্ষাপটে এক অনন্য মানবিক বার্তা নিয়ে সামনে এলো রাঙামাটি শাহ্ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৯৯৮ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা।
শুক্রবার (২৭ মার্চ) রাঙামাটি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের বালুখালী উদ্যান নার্সারী এলাকায় তাদের শৈশব-কৈশরের নির্মল ভ্রাতৃত্ব বন্ধনকে পুনর্জাগরণ হিসেবে “বনভোজন ও পুনর্মিলনী ২০২৬ উদযাপন করেছে।
স্ব-স্ব পবিত্র ধর্মগ্রন্থ পাঠ ও জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের শুভ সূচনা ঘটে।
দীর্ঘ সময় যার যার কর্মস্রোতে ব্যস্ততার অগোচরে থাকা বাস্তবতার ফলে কোমল অন্ত:স্থলের সেই পরিচিত মূখগুলো অনেকটা চেনার আড়ালে ঢাকা পরে অচেনায় রুপ নিতে থাকছে। তাই অচেনা আগন্তুকের মতো নতুন করে নিজ নিজ পরিচিতি তুলে ধরেন প্রত্যেকে।
দীর্ঘ সময়ের ব্যবধান পেরিয়ে তাদের এই পুনর্মিলনী কেবল একটি আনুষ্ঠানিক সমাবেশ নয়, এটি ছিল বিভেদহীন ভ্রাতৃত্ব, বন্ধন ও স্মৃতির এক উজ্জ্বল উদযাপন।
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে ঘেরা রাঙামাটির শান্ত পরিবেশে আয়োজিত এই পুনর্মিলনী যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত বিশ্বের বিপরীতে এক টুকরো প্রশান্তির বার্তা ছড়িয়ে দেয়।
বিভিন্ন পেশা, অবস্থান ও ব্যস্ত জীবনের ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা সত্ত্বেও, ৯৮ ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা মিলিত হয়েছেন তাদের শৈশব-কৈশোরের সেই সোনালি দিনগুলোকে ছুঁয়ে দেখার প্রয়াসে, স্মৃতিচারণে।স্কুল জীবনের দুষ্টুমি, শ্রেণিকক্ষের হাসি-ঠাট্টা, শিক্ষকদের স্নেহমাখা শাসন, সব মিলিয়ে যেন ফিরে এসেছিল সেই হারানো সময়।
পুনর্মিলনীতে অংশগ্রহণকারীদের শ্লোগান ছিল- “বন্ধুত্ব চিরকাল, স্মৃতি অম্লান।”
তাদের এই বক্তব্য বর্তমান সময়ের জন্য একটি শক্তিশালী বার্তা বহণ করে, মানবিক সম্পর্কই পারে বিভেদের দেয়াল ভাঙতে।
প্রতিটি প্রজন্ম যদি তাদের আন্তরিক বন্ধনকে এভাবে সুদৃঢ় ও অম্লান রাখার সংকল্পবদ্ধ হয়, তবে পৃথিবী একদিন জাতি, বর্ণ বৈষম্য ও সংঘাতহীন মানবতায় অলংকৃত হতে পারে এই উদাহরণটুকু তাদের এ প্রয়াসে দেখতে পাওয়া যায়।দিনব্যাপী আয়োজিত অনুষ্ঠানে ছিল সাংস্কৃতিক আয়োজন, যেখানে গান, খেলা-ধুলা ও স্মৃতিচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠে পরিবেশ।
অবশেষে, ভবিষ্যতেও এই বন্ধন অটুট রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন সতীর্থরা। নিয়মিত যোগাযোগ, সামাজিক উদ্যোগ ও পরস্পরের পাশে থাকার অঙ্গীকার নিয়ে তারা বিদায় নেন। তবে বিদায়টি ছিল না বিচ্ছেদের, বরং নতুন করে একসাথে পথচলার সূচনা।
বিশ্বের অশান্ত প্রেক্ষাপটে রাঙামাটি শাহ্ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯৮ ব্যাচের এই পুনর্মিলনী প্রমাণ করে যেখানে দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও যুদ্ধ মানুষকে আলাদা করে, সেখানে অকৃত্রিম বন্ধন মানুষকে একত্রিত করে।
এই আয়োজন তাই শুধু একটি পুনর্মিলনী নয়, এটি এক অনুপ্রেরণার গল্প ও উদাহরণ।#
রাঙ্গামাটির চন্দ্রঘোনা ফেরিঘাটে দেশে প্রথম ক্যাবল স্টেইট সেতু নির্মিত হবে: ব্যয় হবে ১৬৫৮৭১.৮৬ লক্ষ টাকা
রাঙ্গামাটি জেলার কাপ্তাই উপজেলা এবং চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়া উপজেলার মাঝে বয়ে যাওয়া লুসাই কণ্যা কর্ণফুলী নদীর উপর চন্দ্রঘোনা- রাইখালী ফেরিঘাটে ক্যাবল স্টেইট সেতু নির্মানের উদ্যোগ নিয়েছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর । আর এই প্রকল্পের জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে মোট ১৬৫৮৭১.৮৬ লক্ষ টাকা।
বিষয়টি নিশ্চিত করে সোমবার (৩০ মার্চ) দুপুরে সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তরের রাঙামাটির নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা এই প্রতিবেদককে বলেন, ইতিমধ্যে সেতুর চুড়ান্ত নক্সা প্রণয়ন করে প্রকল্প প্রস্তাব(ডিপিপি) সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে প্রেরণ করা হয়েছে। বিগত ৯ মার্চ ২০২৬ তারিখে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে প্রকল্প যাচাই কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কর্ণফুলী নদীর উপর চন্দ্রঘোনা ফেরী ঘাটে ক্যাবল স্টেইট সেতু নির্মাণের জন্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই সেতুটি নির্মিত হলে এটিই হবে বাংলাদেশে প্রথম ক্যাবল স্টেইট সেতু । তিনি আরোও বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় কর্ণফুলি নদীর উপর ৫শত ৩২ মিটার ক্যাবল স্টেইড সেতু নির্মাণ করা হবে। এছাড়া ৪ শত ৫৫ মিটার ভায়াডাক্ট ও ৫শত ১১ মিটার এলিভেটেড সড়ক নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পের আওতায় মূল সেতু ও ভায়াডাক্ট নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৬৮৫০.১৬ লক্ষ টাকা এবং এলিভেটেড সংযোগ সড়ক নির্মাণ সহ অন্যান্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪২০০.২০ লক্ষ টাকা। এই প্রকল্পটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে একনেক সভায় অনুমোদন হলে নির্মাণ কাজ শুরু হবে বলে তিনি জানান। সেতুটির নির্মাণকাল ধরা হয়েছে ১ জুলাই ২০২৬ হতে ৩০ জুন ২০৩১ পর্যন্ত।সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর রাঙ্গামাটির উপ সহকারী প্রকৌশলী কীর্তি নিশান চাকমা বলেন, এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য হলো রাঙামাটি- ঘাগড়া বাংগালহালিয়া-বান্দরবান আঞ্চলিক মহাসড়ক (আর-১৬১) এর ২১ তম কিঃমিঃ এ কর্ণফুলী নদীর উপর দৃষ্টিনন্দন চন্দ্রঘোনা সেতু নির্মাণের মাধ্যমে প্রতিস্থাপন করে রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলার মধ্যকার সড়ক নেটওয়ার্কটি বাধাহীন, উন্নত, নিরাপদ, আরামদায়ক এবং সময় ও ব্যসাশ্রয়ী সড়ক নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠা করা এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলার পর্যটনশিল্পের বিকাশকে ত্বরান্বিত করা। যানবাহন ও মালামাল পরিবহনের জন্য নিরাপদ, টেকসই এবং নির্ভরযোগ্য পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
কাপ্তাই উপজেলা পরিষদ এর সাবেক চেয়ারম্যান দিলদার হোসেন বলেন, এই অঞ্চলের জনগণের দীর্ঘ দিনের একটি স্বপ্ন এই নৌ রুটে সেতু নির্মাণ। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এলাকার জনসাধারণের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করা সম্ভব।

রাঙ্গামাটিতে পার্বত্য জনগোষ্ঠীর চার দিনব্যাপী উৎসব শুরু
রাঙ্গামাটিতে শুরু হয়েছে পার্বত্য জনগোষ্ঠীর প্রধান সামাজিক উৎসব বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান, চাংলান, পাতা ও বিহু। পুরাতন বর্ষ বিদায় ও নতুন বর্ষ বরণকে কেন্দ্র করে পাহাড়ী জনগোষ্ঠী ভিন্ন ভিন্ন নামে এই উৎসব উদযাপন করে।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সকালে রাঙ্গামাটিতে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে উৎসবের উদ্বোধন করা হয়। রাঙ্গামাটি পৌরসভা প্রাঙ্গণে বেলুন ও পায়রা উড়িয়ে অনুষ্ঠান সূচনা করেন সাবেক সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির শীর্ষ নেতা ঊষাতন তালুকদার। শোভাযাত্রা পৌরসভা প্রাঙ্গণ থেকে শুরু হয়ে শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে রাঙ্গামাটি শিল্পকলা একাডেমীর মিলনায়তনে গিয়ে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীরা ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে অংশগ্রহণ করেন এবং নিজেদের সংস্কৃতি তুলে ধরেন।
শোভাযাত্রার পর রাঙ্গামাটির চিংহ্লামং মারী স্টেডিয়ামে শুরু হয় চারদিনব্যাপী অনুষ্ঠানমালা। অনুষ্ঠানে পার্বত্য রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কৃষিবিদ কাজল তালুকদার, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের সাবেক সচিব কৃষ্ণ চন্দ্র চাকমা, সাবেক সচিব ও আদিবাসী ফোরামের সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা, উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ইন্টু মনি তালুকদারসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ঊষাতন তালুকদার বলেন, “পাহাড়ের ১৩টি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী বর্ষ বিদায় ও বরণকে কেন্দ্র করে এই উৎসব পালন করে। বিজু মানে অস্তিত্ব, বিজু মানে সংস্কৃতি। আমরা অনেক ভাষা ও সংস্কৃতি হারিয়েছি। আমাদের সংস্কৃতিকে ভুলে না যাওয়ার দিকে সতর্ক থাকতে হবে। পার্বত্য অঞ্চলকে অবহেলিত না রেখে আমাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করুন। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক, আমরা মানুষ, আমরা মানুষের মতো জীবনযাপন করতে চাই। পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধান জাতীয় ও রাজনৈতিক ইস্যু, স্বদিচ্ছা থাকলে অবশ্যই সমাধান সম্ভব।”
উৎসব চলাকালে অনুষ্ঠিত হবে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, পিঠা উৎসব, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং মঞ্চ নাটক। আয়োজকরা জানিয়েছেন, চারদিনব্যাপী এই অনুষ্ঠান ১২ এপ্রিল শেষ হবে। এরপর ১৭ এপ্রিল মারমা সংস্কৃতি সংস্থার সাংগ্রাই জলোৎসবের মধ্য দিয়ে পার্বত্য রাঙ্গামাটির বৈসাবির আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত হবে।
উল্লেখ্য, পাহাড়ের বিভিন্ন সম্প্রদায় এই সামাজিক উৎসবকে ভিন্নভাবে উদযাপন করে। চাকমা সম্প্রদায় একে বিজু, মারমারা সাংগ্রাই, ত্রিপুরা সম্প্রদায় বৈসু, তংচঙ্গ্যারা বিষু, মুরং সম্প্রদায় চাংক্রান, খুমীরা চাংলান, সাওতালরা পাতা এবং অহমিয়া বা গুর্খারা একে বিহু বলে।#
পাহাড়ের বৈচিত্র্যে মানবিক ঐক্যের সুর: বিজু-সাংগ্রাই-বৈসু-বিষু-চাংক্রান
বসন্তের বিদায় আর নতুন বছরের আবাহনে মুখরিত হয়ে উঠেছে সবুজ পাহাড়ের প্রতিটি জনপদ। প্রকৃতির রুক্ষতা মুছে নতুন কুঁড়ির আগমনে সেজেছে অরণ্য। ঠিক এই সময়েই পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জীবনে বছরের শ্রেষ্ঠ সময়ের উপভোগ্য উৎসব বিজু, সাংগ্রাই, বিষু, চাংলান, চাংক্রান, বৈসু ইত্যাদি চৈত্র সংক্রান্তি ও বর্ষবরণ শুরু হচ্ছে। এ যেন পাহাড়ের বৈচিত্র্যে একই সুতোয় গাঁথা মানবিক ঐক্যের তান, লয় ও সুরের মূর্ছনা।
নামের ভিন্নতা থাকলেও সুর একটাই- মৈত্রী, সম্প্রীতি আর উৎসব। চাকমাদের ‘বিজু’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’, ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’, তঞ্চঙ্গ্যাদের ‘বিষু’, ম্রো ও চাকদের ‘চাংক্রান’। বাঙালির নববর্ষ আর পাহাড়ের এই প্রাণের উৎসব মিলেমিশে একাকার হয়ে পাহাড়ের বুকে তৈরি করেছে এক অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মহোৎসব।
রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি আর বান্দরবান—এই তিন পার্বত্য জেলায় এখন যেন দম ফেলার সময় নেই। শহরের বনরূপা, তবলছড়ি কিংবা রিজার্ভ বাজার থেকে শুরু করে দুর্গম পাহাড়ের ছোটো বাজারগুলোতেও মানুষের উপচে পড়া ভিড়। চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী পিনোন-হাদি, মারমাদের থামি, আর ত্রিপুরাদের রিনাই-রিসার দোকানে তরুণ-তরুণীদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন এসব পোশাকে এসেছে নতুন নতুন নকশা, যা কেবল পাহাড়িদের নয়, পর্যটকদেরও ভীষণভাবে আকর্ষণ করছে।
শুধু পোশাক নয়, পাহাড়ের বাজারে এখন সুবাস ছড়াচ্ছে বনজ সবজি। চৈত্র সংক্রান্তি আর বর্ষবরণের অপরিহার্য অনুষঙ্গ ‘পাঁজন’ রান্নার জন্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বাঁশকোড়ল, তারা গাল্ল্যা, পাহাড়ি আলু আর হরেক রকমের বুনো সবজি। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছে উৎসবের প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করতে।
পাহাড়ি সম্প্রদায়ের এই উৎসব সাধারণত তিন দিনব্যাপী চলে। তবে এর প্রস্তুতি চলে মাসজুড়ে। ১২ এপ্রিল ফুল বিজু ও বৈসু, এ সময়ে পাহাড়ি হ্রদে ফুল দিয়ে প্রার্থনা করা হয়, অনেকে বলে থাকে ফুল ভাসানো হয়, প্রকৃতপক্ষে চাকমা সম্প্রদায় ফুলকে শ্রদ্ধা করে, প্রণাম করে- একে ভাসায় না বরং গছিয়ে দেয়। ১৩ এপ্রিল ৩০ চৈত্র বাংলা বর্ষের শেষ দিন হলো মূল বিজু ও বৈসু। এদিনে নতুন কাপড় পরিধান করা হয়, এদিনে চাকমা সম্প্রদায় জুনিয়রদের সেলামি দিয়ে থাকে এবং বাড়িতে বাড়িতে পাজন রন্ধন (অনেক সবজির সমষ্টিতে বিশেষ খাবার) উৎসব উদযাপিত হয় এবং ১৪ এপ্রিল নববর্ষ বুদ্ধিস্ট সম্প্রদায় প্রার্থনার জন্য খেয়াং-এ আসেন এবং মারমা সম্প্রদায় সাংগ্রাই উৎসবে জলকেলি ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে থাকে।
উৎসবের প্রথম দিনকে বলা হয় ‘ফুল বিজু’। ১২ এপ্রিল ভোরে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীরা পাহাড়ি ঝরনা বা হ্রদের তীরে ভিড় জমায়। তারা ফুল সংগ্রহ করে নদী বা কাপ্তাই হ্রদের শান্ত জলে ফুল সমপর্ণ করে প্রার্থনা করে। এটি পুরনো বছরের গ্লানি মুছে ফেলার এবং প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর এক প্রতীকী আয়োজন। ঘরদোর ফুল দিয়ে সাজানো আর পবিত্র স্নানের মাধ্যমে তারা নতুন দিনকে স্বাগত জানায়।
১৩ এপ্রিল অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তির দিনটি হলো ‘মূল বিজু’। এই দিনে ঘরে ঘরে রান্না হয় ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘পাঁজন’। এটি কেবল একটি খাবার নয়, এটি হলো পাহাড়ি সংস্কৃতির এক বিশাল সমন্বয়। কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪০ প্রকারের সবজি (অনেকে ১০৮ রকমের সবজি ব্যবহার করেন) দিয়ে রান্না করা এই খাবারটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও সুস্বাদু। এই দিনে পাহাড়িদের ঘরে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। পরিচিত-অপরিচিত যে কেউ বাড়িতে আসলে তাদের পাঁচন দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। বাড়িতে বাড়িতে চলে আড্ডার আসর আর আনন্দ আয়োজন।
১৪ এপ্রিল, পহেলা বৈশাখের দিনটি হলো বিশ্রামের। চাকমা ভাষায় একে বলা হয় ‘গোরজ্যাপোরজ্যা দিন’। এই দিনে বড়োদের আশীর্বাদ নেওয়া হয়, মন্দিরে গিয়ে বুদ্ধ পূজা করা হয় এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের স্নান করিয়ে নতুন কাপড় উপহার দেওয়া হয়। মারমা সম্প্রদায় এই দিনে আয়োজন করে তাদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় উৎসব ‘জলকেলি’ বা পানি খেলা।
মারমা সম্প্রদায়ের নববর্ষ উৎসব ‘সাংগ্রাই’-এর মূল আকর্ষণ হলো জলকেলি, যা তাদের ভাষায় ‘রি-লং পোয়ে’ নামে পরিচিত। তারা বিশ্বাস করে, পানি দিয়ে একে অপরকে ভেজানোর মাধ্যমে গত বছরের সমস্ত পাপ, দুঃখ আর গ্লানি ধুয়ে মুছে যায়। এটি কেবল খেলা নয়, এটি তরুণ-তরুণীদের একে অপরের প্রতি ভালোবাসা এবং সম্প্রীতি প্রকাশের এক শৈল্পিক মাধ্যম। জলকেলির সেই দৃশ্য দেখতে প্রতি বছর ভিড় জমায় হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক।
এ ধরনের উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ‘পাঁচন’ বা ‘পাজন’। রন্ধনকৃত সুস্বাদু এই তরকারিতে বাঁশকোড়ল, পাহাড়ি কচু, শিম বিচি, কাঁঠালের বিচি, মটরশুঁটি এবং বিভিন্ন বুনো শাকসবজি ব্যবহার করা হয়। স্বাদের ভিন্নতা আনতে অনেকে এতে শুটকি মাছ বা ‘সিদল’ (এক প্রকার পাহাড়ি শুটকি পেস্ট) ব্যবহার করেন। রান্নার বৈশিষ্ট্য হলো এর ধীর জ্বাল। মাটির উনুনে অনেকক্ষণ ধরে রান্না করায় সবজির রসগুলো মিলেমিশে এক অপূর্ব স্বাদ তৈরি করে। পাহাড়ের মানুষের মতে, বছরের এই দিনে পাঁচন খেলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
উৎসব চলাকালীন পাহাড়ের আনাচে-কানাচে চলে লোকজ ক্রীড়া ও নৃত্যের মহড়া। ত্রিপুরাদের ‘গরাইয়া নৃত্য’ এক অনন্য আকর্ষণ। মুখোশ পরে আর হাতে লাঠি নিয়ে এই নৃত্যে ফুটে ওঠে প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থার চিত্র। এছাড়াও চাকমাদের ‘ঘিলা খেলা’, ‘বলি খেলা’ আর ম্রোদের ‘বাঁশি নাচ’ উৎসবের রং বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। ছোটো ছোটো পাহাড়ের চূড়ায় যখন বাঁশির সুর ভেসে বেড়ায়, তখন মনে হয় পুরো প্রকৃতি যেন উৎসবে মেতেছে।
বিগত কয়েক বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই উৎসব কেবল পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সমতলের বাঙালি আর পাহাড়ের বিভিন্ন সম্প্রদায় জাতিগোষ্ঠীর মেলবন্ধনে এটি এখন জাতীয় উৎসবে রূপ নিয়েছে। প্রযুক্তি ও যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতির ফলে দুর্গম পাহাড়ের এসব উৎসব এখন পর্যটকদের জন্য অনেক বেশি উপলভ্য হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নিরাপত্তা বেষ্টনী আর পাহাড়িদের অকৃত্রিম ভালোবাসায় এই অঞ্চল হয়ে ওঠে পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দু। খাগড়াছড়ির আলুটিলা, সাজেক ভ্যালি কিংবা বান্দরবানের নীলগিরি- সবখানেই এখন পাহাড়ি এসব আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানের রেশ।
বিজু, সাংগ্রাই, বিষু, চাংলান, চাংক্রান কিংবা বৈসু নাম যা-ই হোক না কেন, এই উৎসবের মূল বাণী হলো শান্তি। পাহাড়ের মানুষ চায় তাদের কৃষ্টি, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি টিকে থাকুক অনাদিকাল। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে নতুন বছরে পাহাড় হয়ে উঠুক শান্তির এক লীলাভূমি। ১২ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই উৎসব যখন ১৪ এপ্রিল শেষ হবে, তখন যেন সবার মনে একটাই আশা থাকে- আগামী দিনগুলো যেন পাহাড়ের ঝরনার মতোই স্বচ্ছ এবং চিরহরিৎ বনের মতোই প্রাণবন্ত হয় #
পাহাড়ের বৈচিত্র্যে মানবিক ঐক্যের সুর: বিজু-সাংগ্রাই-বৈসু-বিষু-চাংক্রানমো. রেজুয়ান খান
বসন্তের বিদায় আর নতুন বছরের আবাহনে মুখরিত হয়ে উঠেছে সবুজ পাহাড়ের প্রতিটি জনপদ। প্রকৃতির রুক্ষতা মুছে নতুন কুঁড়ির আগমনে সেজেছে অরণ্য। ঠিক এই সময়েই পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জীবনে বছরের শ্রেষ্ঠ সময়ের উপভোগ্য উৎসব বিজু, সাংগ্রাই, বিষু, চাংলান, চাংক্রান, বৈসু ইত্যাদি চৈত্র সংক্রান্তি ও বর্ষবরণ শুরু হচ্ছে। এ যেন পাহাড়ের বৈচিত্র্যে একই সুতোয় গাঁথা মানবিক ঐক্যের তান, লয় ও সুরের মূর্ছনা।
নামের ভিন্নতা থাকলেও সুর একটাই- মৈত্রী, সম্প্রীতি আর উৎসব। চাকমাদের ‘বিজু’, মারমাদের ‘সাংগ্রাই’, ত্রিপুরাদের ‘বৈসু’, তঞ্চঙ্গ্যাদের ‘বিষু’, ম্রো ও চাকদের ‘চাংক্রান’। বাঙালির নববর্ষ আর পাহাড়ের এই প্রাণের উৎসব মিলেমিশে একাকার হয়ে পাহাড়ের বুকে তৈরি করেছে এক অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মহোৎসব।
রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি আর বান্দরবান—এই তিন পার্বত্য জেলায় এখন যেন দম ফেলার সময় নেই। শহরের বনরূপা, তবলছড়ি কিংবা রিজার্ভ বাজার থেকে শুরু করে দুর্গম পাহাড়ের ছোটো বাজারগুলোতেও মানুষের উপচে পড়া ভিড়। চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী পিনোন-হাদি, মারমাদের থামি, আর ত্রিপুরাদের রিনাই-রিসার দোকানে তরুণ-তরুণীদের ভিড় চোখে পড়ার মতো। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এখন এসব পোশাকে এসেছে নতুন নতুন নকশা, যা কেবল পাহাড়িদের নয়, পর্যটকদেরও ভীষণভাবে আকর্ষণ করছে।
শুধু পোশাক নয়, পাহাড়ের বাজারে এখন সুবাস ছড়াচ্ছে বনজ সবজি। চৈত্র সংক্রান্তি আর বর্ষবরণের অপরিহার্য অনুষঙ্গ ‘পাঁজন’ রান্নার জন্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বাঁশকোড়ল, তারা গাল্ল্যা, পাহাড়ি আলু আর হরেক রকমের বুনো সবজি। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছে উৎসবের প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহ করতে।
পাহাড়ি সম্প্রদায়ের এই উৎসব সাধারণত তিন দিনব্যাপী চলে। তবে এর প্রস্তুতি চলে মাসজুড়ে। ১২ এপ্রিল ফুল বিজু ও বৈসু, এ সময়ে পাহাড়ি হ্রদে ফুল দিয়ে প্রার্থনা করা হয়, অনেকে বলে থাকে ফুল ভাসানো হয়, প্রকৃতপক্ষে চাকমা সম্প্রদায় ফুলকে শ্রদ্ধা করে, প্রণাম করে- একে ভাসায় না বরং গছিয়ে দেয়। ১৩ এপ্রিল ৩০ চৈত্র বাংলা বর্ষের শেষ দিন হলো মূল বিজু ও বৈসু। এদিনে নতুন কাপড় পরিধান করা হয়, এদিনে চাকমা সম্প্রদায় জুনিয়রদের সেলামি দিয়ে থাকে এবং বাড়িতে বাড়িতে পাজন রন্ধন (অনেক সবজির সমষ্টিতে বিশেষ খাবার) উৎসব উদযাপিত হয় এবং ১৪ এপ্রিল নববর্ষ বুদ্ধিস্ট সম্প্রদায় প্রার্থনার জন্য খেয়াং-এ আসেন এবং মারমা সম্প্রদায় সাংগ্রাই উৎসবে জলকেলি ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে থাকে।
উৎসবের প্রথম দিনকে বলা হয় ‘ফুল বিজু’। ১২ এপ্রিল ভোরে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীরা পাহাড়ি ঝরনা বা হ্রদের তীরে ভিড় জমায়। তারা ফুল সংগ্রহ করে নদী বা কাপ্তাই হ্রদের শান্ত জলে ফুল সমপর্ণ করে প্রার্থনা করে। এটি পুরনো বছরের গ্লানি মুছে ফেলার এবং প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর এক প্রতীকী আয়োজন। ঘরদোর ফুল দিয়ে সাজানো আর পবিত্র স্নানের মাধ্যমে তারা নতুন দিনকে স্বাগত জানায়।
১৩ এপ্রিল অর্থাৎ চৈত্র সংক্রান্তির দিনটি হলো ‘মূল বিজু’। এই দিনে ঘরে ঘরে রান্না হয় ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘পাঁজন’। এটি কেবল একটি খাবার নয়, এটি হলো পাহাড়ি সংস্কৃতির এক বিশাল সমন্বয়। কমপক্ষে ৩০ থেকে ৪০ প্রকারের সবজি (অনেকে ১০৮ রকমের সবজি ব্যবহার করেন) দিয়ে রান্না করা এই খাবারটি অত্যন্ত পুষ্টিকর ও সুস্বাদু। এই দিনে পাহাড়িদের ঘরে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। পরিচিত-অপরিচিত যে কেউ বাড়িতে আসলে তাদের পাঁচন দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়। বাড়িতে বাড়িতে চলে আড্ডার আসর আর আনন্দ আয়োজন।
১৪ এপ্রিল, পহেলা বৈশাখের দিনটি হলো বিশ্রামের। চাকমা ভাষায় একে বলা হয় ‘গোরজ্যাপোরজ্যা দিন’। এই দিনে বড়োদের আশীর্বাদ নেওয়া হয়, মন্দিরে গিয়ে বুদ্ধ পূজা করা হয় এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের স্নান করিয়ে নতুন কাপড় উপহার দেওয়া হয়। মারমা সম্প্রদায় এই দিনে আয়োজন করে তাদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় উৎসব ‘জলকেলি’ বা পানি খেলা।
মারমা সম্প্রদায়ের নববর্ষ উৎসব ‘সাংগ্রাই’-এর মূল আকর্ষণ হলো জলকেলি, যা তাদের ভাষায় ‘রি-লং পোয়ে’ নামে পরিচিত। তারা বিশ্বাস করে, পানি দিয়ে একে অপরকে ভেজানোর মাধ্যমে গত বছরের সমস্ত পাপ, দুঃখ আর গ্লানি ধুয়ে মুছে যায়। এটি কেবল খেলা নয়, এটি তরুণ-তরুণীদের একে অপরের প্রতি ভালোবাসা এবং সম্প্রীতি প্রকাশের এক শৈল্পিক মাধ্যম। জলকেলির সেই দৃশ্য দেখতে প্রতি বছর ভিড় জমায় হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক।
এ ধরনের উৎসবের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ‘পাঁচন’ বা ‘পাজন’। রন্ধনকৃত সুস্বাদু এই তরকারিতে বাঁশকোড়ল, পাহাড়ি কচু, শিম বিচি, কাঁঠালের বিচি, মটরশুঁটি এবং বিভিন্ন বুনো শাকসবজি ব্যবহার করা হয়। স্বাদের ভিন্নতা আনতে অনেকে এতে শুটকি মাছ বা ‘সিদল’ (এক প্রকার পাহাড়ি শুটকি পেস্ট) ব্যবহার করেন। রান্নার বৈশিষ্ট্য হলো এর ধীর জ্বাল। মাটির উনুনে অনেকক্ষণ ধরে রান্না করায় সবজির রসগুলো মিলেমিশে এক অপূর্ব স্বাদ তৈরি করে। পাহাড়ের মানুষের মতে, বছরের এই দিনে পাঁচন খেলে শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।
উৎসব চলাকালীন পাহাড়ের আনাচে-কানাচে চলে লোকজ ক্রীড়া ও নৃত্যের মহড়া। ত্রিপুরাদের ‘গরাইয়া নৃত্য’ এক অনন্য আকর্ষণ। মুখোশ পরে আর হাতে লাঠি নিয়ে এই নৃত্যে ফুটে ওঠে প্রাচীন সমাজ ব্যবস্থার চিত্র। এছাড়াও চাকমাদের ‘ঘিলা খেলা’, ‘বলি খেলা’ আর ম্রোদের ‘বাঁশি নাচ’ উৎসবের রং বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ। ছোটো ছোটো পাহাড়ের চূড়ায় যখন বাঁশির সুর ভেসে বেড়ায়, তখন মনে হয় পুরো প্রকৃতি যেন উৎসবে মেতেছে।
বিগত কয়েক বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই উৎসব কেবল পাহাড়ি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সমতলের বাঙালি আর পাহাড়ের বিভিন্ন সম্প্রদায় জাতিগোষ্ঠীর মেলবন্ধনে এটি এখন জাতীয় উৎসবে রূপ নিয়েছে। প্রযুক্তি ও যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতির ফলে দুর্গম পাহাড়ের এসব উৎসব এখন পর্যটকদের জন্য অনেক বেশি উপলভ্য হয়েছে। জেলা প্রশাসনের নিরাপত্তা বেষ্টনী আর পাহাড়িদের অকৃত্রিম ভালোবাসায় এই অঞ্চল হয়ে ওঠে পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দু। খাগড়াছড়ির আলুটিলা, সাজেক ভ্যালি কিংবা বান্দরবানের নীলগিরি- সবখানেই এখন পাহাড়ি এসব আকর্ষণীয় অনুষ্ঠানের রেশ।
বিজু, সাংগ্রাই, বিষু, চাংলান, চাংক্রান কিংবা বৈসু নাম যা-ই হোক না কেন, এই উৎসবের মূল বাণী হলো শান্তি। পাহাড়ের মানুষ চায় তাদের কৃষ্টি, ঐতিহ্য আর সংস্কৃতি টিকে থাকুক অনাদিকাল। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে নতুন বছরে পাহাড় হয়ে উঠুক শান্তির এক লীলাভূমি। ১২ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই উৎসব যখন ১৪ এপ্রিল শেষ হবে, তখন যেন সবার মনে একটাই আশা থাকে- আগামী দিনগুলো যেন পাহাড়ের ঝরনার মতোই স্বচ্ছ এবং চিরহরিৎ বনের মতোই প্রাণবন্ত হয় #