
চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ–সাতকানিয়া আংশিক) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে চন্দনাইশ উপজেলার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন আহমেদের মনোনয়ন পাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই বিএনপির স্থানীয় রাজনীতিতে অস্বস্তি ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
রোববার (২৮ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় মনোনয়নের খবর প্রকাশের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়, যেখানে তার রাজনৈতিক অবস্থান ও অতীত ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে।
জানা গেছে, গত ২১ ডিসেম্বর দুপুরে জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে জসিম উদ্দিন আহমেদের পক্ষে তার আইনজীবী রাশেদ হামিদ মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) সেটি জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
গত বছরের ৪ ডিসেম্বর জসিম উদ্দিনকে ঢাকার হোটেল লা-মেরিডিয়ানের পাশের রাস্তা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় রাজধানীর বাড্ডার এক হত্যাচেষ্টা মামলায় এজাহারভুক্ত ২১ নম্বর আসামি তিনি। পরে অবশ্য তিনি জামিনে বেরিয়ে বিদেশে চলে যান।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবিতে দেখা যায়, জসিম উদ্দিন আহমেদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ এবং আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ মুহূর্ত। এসব ছবি শেয়ার করে অনেক নেতা-কর্মী জানতে চান, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এমন ঘনিষ্ঠতার পরও তিনি কীভাবে বিএনপির প্রার্থী হন।
যদিও সন্ধ্যা পর্যন্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি, তবে চট্টগ্রামের রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে পাঠানো তথ্যে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে জসিম উদ্দিন আহমেদের নাম রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের তথ্যমতে, জসিম উদ্দিন আহমেদ সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সহযোগী। তার মালিকানায় কক্সবাজারে ‘রামাদা কক্সবাজার’ ও দুবাইয়ে ‘রামাদা দুবাই’ নামে হোটেল রয়েছে। চট্টগ্রাম নগরের লালদীঘি এলাকায় ‘মহল মার্কেট’, খুলশীতে ‘জসিম হিল পার্ক’সহ একাধিক বাণিজ্যিক ও আবাসিক স্থাপনার মালিকানাও তার নামে। এসব সম্পদের উৎস ও স্বল্প সময়ে বড় পরিসরে উত্থান ঘিরে নানা অভিযোগও আলোচিত।
আরও অভিযোগ রয়েছে, তিনি সাবেক দুই আইজিপি বেনজীর আহমেদ ও শহিদুল হকের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন এবং আওয়ামী লীগের একাধিক প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠতা পেয়েছিলেন। একই সঙ্গে ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিয়ে তিনি চন্দনাইশ উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
স্থানীয় বিএনপি নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে যিনি সুবিধাভোগী ছিলেন, তার হাতে ধানের শীষ তুলে দেওয়া দলীয়ভাবে বিব্রতকর এবং এতে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জনশ্রুতি আছে ১০ জুলাই পদ্মা ব্যাংকের ঋণখেলাপির এক মামলায় জসিম উদ্দিন ও তার স্ত্রী তানজিনা সুলতানাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয় চট্টগ্রামের অর্থঋণ আদালত।
তারও আগে গত ৩০ এপ্রিল ঋণখেলাপির মামলায় জসিম ও তার স্ত্রীকে পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দিয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। এই আদেশের বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ আনতে জসিম হাই কোর্টে যান। ঋণের ১৪ কোটি টাকা পরিশোধ করেছেন জানিয়ে সেখানে তিনি জাল পে-অর্ডারের ফটোকপি দেন। পরে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জামিন স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করলে বিষয়টি ধরা পড়ে। এরপর তার জামিন বাতিল করে হাই কোর্ট।
ওই মামলার অভিযোগে বলা হয়, জেসিকা ট্রেড ইন্টারন্যাশনালের কর্ণধার জসিম উদ্দিন ২০১৬ সালে পদ্মা ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা থেকে ৬০ কোটি টাকা ঋণ নেন। এক বছরের মধ্যে তা পরিশোধ করার চুক্তি থাকলেও আট বছরেও তিনি তা শোধ করেননি।
২০২২ সালে সম্পূর্ণ সুদ মওকুফ-সুবিধা নিয়ে তিনি ওই ঋণ পুনঃ তফসিল করেন। কিন্তু তারপরও পরিশোধ না করায় ওই ঋণ সুদাসলে প্রায় ১১৫ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
ঋণের বিপরীতে চট্টগ্রামের লালদীঘি এলাকার ১৬ দশমিক ৫৯ শতক জমির ওপর নির্মিত সাততলা মহল মার্কেট তিনি ব্যাংকের কাছে জামানত রেখেছেন। ঋণ শোধ না করায় ২০২০ সালের ১৮ জুলাই জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে মামলা করে পদ্মা ব্যাংক। ওই মামলায় ২৯ জানুয়ারি জসিমকে সুদসহ ঋণ পরিশোধের নির্দেশ দেয় আদালত। তারপরও ঋণ শোধ না করায় তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি হয় #